জ্বালানির বিকল্প কালো মাটি সংগ্রহে ব্যস্ত হাওরাঞ্চলের গৃহিনীরা

জ্বালানির বিকল্প কালো মাটি সংগ্রহে ব্যস্ত হাওরাঞ্চলের গৃহিনীরা

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি:সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের বিভিন্ন নদী, বিল ও হাওর থেকে সংগৃহীত কালো মাটি রান্নার কাজে বিকল্প জ্বালানি হিসাবে ব্যবহার করছে গৃহিনীরা। এই মাটি জ্বালাতে কষ্ট হয় না। কাঠের লাকড়ি ও গ্যাসের মত সহজেই জ্বলে। তাই এর ব্যাপক চাহিদা বাড়ছে গৃহিনী ও সবস্তরের জনসাধারণের মাঝে।

এলাকার মানুষের মধ্যে কালো মাটি সংগ্রহের তথ্য জানতে গিয়ে জ্বালানির অপার সম্ভাবনার কথা জানায় স্থানীয়রা।

জেলার সদর, তাহিরপুর, জামালগঞ্জ, ধর্মপাশা, বিশ্বাম্ভরপুর, মধ্যনগড়, দিরাই, শাল্লাসহ ১১টি উপজেলার নদী ও সীমান্ত নদীগুলোর মাধ্যমে প্রবাহিত পাহাড়ী ঢলে সঙ্গে ভেঁসে আসা গাছের পাতা, ডালপালা, নদী, বিল ও হাওরের মাটির সঙ্গে মিশে থাকে। শুষ্ক মৌসুমে ফাল্গুন মাস থেকে চৈত্র মাসের মাঝামাঝি সময় প্রতিটি উপজেলার গ্রামের লোকজন নদী, বিল ও হাওরের শুকিয়ে গেলেই ৪-৫ ফুট মাটি খুড়লেই বেড়িয়ে আসে গুপ্তধনের মত লুকায়িত কালো মাটি ও লাকড়ি। মাটি সংগ্রহ করার পর ৩-৪দিন সূর্যের আলোতে ভালোভাবে শুকিয়ে রান্নার জ্বালানীর উপযোগী করা হয়। এ মাটি ব্যবহার প্রায় ২০ বছর আগে থেকেই রান্নার কাজে ব্যবহার করে আসছে হাওরাঞ্চলের গৃহিনীরা। এই কালো মাটি বিক্রি করে বাড়তি আয়ও করছে শতশত পরিবার।

সংগ্রহ করা মাঝারি আকারের এক বস্তা জ্বালানি উপযোগী কালো মাটি বিক্রি হয় দু-শত টাকার অধিক। জেলার বিভিন্ন উপজেলার বাড়ির পাশাপাশি হোটেল, রেস্তোরায় এই কালো মাটি ব্যবহার করা হচ্ছে।

সরজমিনে জেলার সদর উপজেলার লালপুর সেতু এলাকায় গিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কালো মাটি জ্বালানি হিসাবে দিনদিন জনপ্রিয় হচ্ছে লালপুরসহ আশপাশের গ্রামগুলোতে। প্রতি বছর এই সময় গজারিয়া খালের একটি বড় অংশের পানি কম থাকায় সহজেই কালো মাটি সংগ্রহ করতে পারে এলাকার জনসাধারণ। কালমাটি জ্বালানির অপার সম্ভাবনার কথাও জানায় তারা। দুই শতাধিক পরিবারের জ্বালানি হিসাবে ব্যবহারের জন্য কালো মাটি কয়লা সংগ্রহের কাজে ব্যস্ত থাকেন। প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পানিতে ডুবাডুবি করে কালো মাটি সংগ্রহ করেন তারা। এতে পাঁচ থেকে ছয় মাসের জ্বালানির চাহিদা মেটানো সম্ভব হয়। গত সাত বছর আগে গজারিয়ার খালের উপর রাবারড্যাম সেতু নির্মাণ হয়েছে। সেতুটির দক্ষিণপাড়ে গৌরারং ইউনিয়নের শেষ প্রান্ত লালপুর গ্রাম। সেতুর উত্তরাংশে সলুকাবাদ ইউনিয়নের ভাদেটেক গ্রাম। এই দুই গ্রামের মানুষজন ছাড়াও আশপাশের ও অন্যান্য গ্রামের মানুষজন দৈনন্দিন জ্বালানি সংগ্রহ করেন এই কালোমাটি। রাবার ড্রাম্পের সেতুর নিচে ও লালপুর সেতু সেতু থাকা ফাউন্ডেশনের বিশাল পাকা স্থানে ও মাটিতে কালমাটি শুকিয়ে বস্তা বা টুকরি ভর্তি করে বাড়িতে নিয়ে যান সংগ্রহকারীরা।

লালপুর গ্রামের সাজেদা বেগম ও মালকাবানু জানান, আগে কখনও এত কালো মাটি এখানে খোঁজে পাওয়া যেত না। গত কয়েক বছর ধরে এই কালো মাটি সন্ধান পেয়েছেন তাঁরা প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকার ছোট ও বড়রা মিলে মাটি সংগ্রহের কাজে ব্যস্ত থাকেন।

শাহপরান, শফিকুল বলেন, কালো মাটি পরিবেশবান্ধব ও সাশ্রয়ী শুধু একটু পরিশ্রমের ফলেই লালপুর নদীজুড়ে কালো মাটি খোঁজে পাওয়া যায়। এই কালো মাটি সংগ্রহ ও বিক্রি করে অনেকেই তাদের পরিবার পরিচালনা করছে। এক মৌসুমে এক জন নারী/পরুষ একশত থেকে দেড়শত মণ কালো মাটি সংগ্রহ করতে পারে।

জেলার সচেতন এলাকাবাসী জানান, হাওরাঞ্চলে বর্ষাকালে চারদিকে পানিতে ভরপুর থাকায় জ্বালানী সংগ্রহ করতে না পারায় জ্বালানির তীব্র সংকটের কারণে ভোগান্তির শেষ নেই হাওর পাড়ের মানুষের। তাই শুষ্ক মৌসুমে হাওর পাড়ের গৃহিনীরা সারা বছরের জ্বালানি হিসাবে বাড়িতে কালো মাটি সংগ্রহ করে রাখেন।

জেলা আ,লীগের কৃষি ও সমবায় বিষয়ক সম্পাদক ও তাহিরপুর উপজেলা পরিষদ চেয়াম্যান করুনা সিন্ধু চৌধুরী বাবুল বলেন, ‘হাওরবাসী নদী, বিল ও হাওর থেকে খুব কষ্ট করে মাটি খুঁড়ে কালো মাটি সংগ্রহ করে উপকৃত হচ্ছে। আর জ্বালানি হিসাবে গ্যাস ও কাঠের লাকড়ির চেয়ে অনেক গুণ ভালো। আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে এই কালো মাটি বাজার জাত করলে কাঠ ও গ্যাসের উপর চাপ কম পড়ে এবং সাধারণ মানুষ উপকৃত হবে।